--এসব কিছু সহ্য করার মতন ক্ষমতা যেনো আমার নাই।সাজিয়াকে জড়িয়ে ধরে সজোড়ে এক চিৎকার মেরে কেঁদে উঠলাম!হটাৎ এই দেখি আমি ফ্লোরে পড়ে আছি।আসেপাশে তাকিয়ে কি হয়েছে সেটা বুঝার চেষ্টা করলাম।পরক্ষণেই বুঝতে পারলাম,যে আমি সাজিয়াকে নিয়ে উল্টা-পাল্টা স্বপ্ন দেখেছি।চারপাশের দেওয়াল গুলো ভো,ভো করে ঘুরতে লাগলো!মাথায় খুব পেইন হচ্ছে খাট থেকে ফ্লোরে পড়ে যাওয়ায়।আসলে দেওয়াল ঘুরছে না,ঘুরছে হলো আমার মাথা।
তখনি সাজিয়ার কথা মনে পড়লো।কি সব বাজে স্বপ্ন দেখলাম ওকে নিয়ে।নাহ,ওকে গিয়ে এক পলক দেখে আসি,যে সে কি করছে।মোবাইলের ফ্লাশ অন করে চলে গেলাম সাজিয়ার রুমে।
রাত বাজে তিনটা।
সাজিয়ার রুমে গিয়ে বড় ধরনের একটা শকট খেলাম!যেভাবে স্বপ্ন দেখেছিলাম,ঠিক সেই রকম ভাবে মরার মতন ফ্লোরে শুয়ে আছে সাজিয়া।এটা দেখে বুকটা ধুপ করে উঠলো!ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম,যে ওর মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে কিনা।কিন্তু নাহ,সব কিছুই নরমাল আছে।সাজিয়া এই সাজিয়া,ওকে ডাক দিতেই এক লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো।
--এই,কেক,কেক,কে?
--আরেহ আমি আকাশ।
--তুমি এতো রাতে আমার রুমে কি করো?
--আসলে তোমায় দেখতে আসলাম।আর তুমি ফ্লোরে শুয়ে আছো কেনো?
--গরম লাগছিলো,তাই ফ্লোরে শুয়ে আছি।আর আজ হটাৎ তুমি এত রাতে আমাকে দেখতে এসেছো।কাহিনী তো কিছু একটা আছে মনে হচ্ছে।কি হয়েছে বলো তো?
--আসলে তোমাকে নিয়ে একটা বাজে স্বপ্ন দেখলাম।যে তুমি বিষ খেয়ে সুইসাইড করার চেষ্টা করেছো।তাই তোমায় দেখতে আসলাম।
--হা,হা,হা,আকাশ তুমি পাগল হয়ে গেলে নাকি?
তোমাকে কি আমার পাগল মনে হয়?যে প্রিয় মানুষটা কষ্ট দিয়েছে বলে কায়ার এর মতন সুইসাইড করবো?
--নাহ,আমি সেটা বলিনি।খারাপ স্বপ্ন দেখলাম,তাই আরকি দেখতে এসেছি।
--হয়েছে থাক,আর কেয়ার করতে হবে না।আর শুনো,আমি কোনো ধরনের পাগলামো করবো না।
তুমি ছেড়ে দিলে হাসিমুখে বিদায় হয়ে চলে যাবো।
যে আমাকে ভালোই বাসে না,তার জন্য নিজের এমন মূল্যবান জীবনটা নষ্ট করবো না।
--চলে আসলাম সাজিয়ার রুম থেকে।মেয়েটার একেকটা কথা যেনো বুকের ভিতরে এসে লেগেছে।
আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারছি না,যে আমার জীবনটা কোন দিকে যাচ্ছে!এর শেষ কোথায় গিয়ে হবে।সাজিয়া আমায় ভালোবাসে,কিন্তু তার করা আচরণের জন্য তার থেকে আমি দূরে সরে গিয়েছি।
অন্যদিকে ফাহমিদা আমায় খুব ভালো বোঝে।তাকেও আমি ছাড়তে চাইনা।এখন কি করবো আমি!দুই নৌকায় পাড়া দিয়ে যে নিজের বিপদ ডেকে আনছি।
নাহ,একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে আমাকে।বিছানায় শুয়ে এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল বেলা...
উঠে নাস্তা করে সোজা অফিসে।সাজিয়া নাস্তা বানিয়ে টেবিলের উপরে রেখে দিয়েছিলো।আমার সামনে আসেনি সে।আর আমিও তাকে ডাক খোঁজ দেইনি।কারন তার সাথে কি কথা বলবো আমি।কথাই যেনো খুঁজে পাইনা এখন।চোখে মুখের এক্সপ্রেশন এমন,যে দেখে বুঝা যায়,সে আমায় ভালোবাসে।তবে গোপনে অন্য পুরুষের সাথে..
নাহ,আর ভাবতে পারছি না আমি।আমি ফাহমিদাকেই বিয়ে করবো।
অফিসে পৌঁছে গতকালের ন্যায় ফাহমিদার সাথে বসে বসে গল্প করছি।সে আমার জন্য বাসা থেকে নাস্তা বানিয়ে এনেছে।
--স্যার হা করেন,আমি আপনাকে খাইয়ে দিচ্ছি।
খেয়ে বলবেন কেমন হয়েছে।
--ফাহমিদা তোমার রান্নার জওয়াব হয় না।অসাধারণ রান্না।ফাহমিদার হাতের রান্না খেয়ে ওর দিকে ধীরে ধীরে দূর্বল হতে লাগলাম।মনটা যেনো পার্মানান্ট ফাহমিদার উপরেই বসে যাবে।এসব নিয়ে ভাবছিলাম।তখনি ফাহমিদা বলে উঠলো...
--স্যার আমরা কবে বিয়ে করছি?
--সেটা নিয়ে তো এখনো ভাবিনি।তবে অতিশীঘ্রই করে ফেলবো।
--স্যার,এটা বললে তো হবে না।একটা ডেট তো ঠিক করুন।আমার তো নিজেকেই প্রস্তুত করতে হবে বিয়ের জন্য।
--আচ্ছা ওয়েট,আমার এক পরিচিত উকিল আছে।উনার সাথে কথা বলে দেখি,উনি কি বলে।
উকিলকে ফোন দিলাম ফাহমিদার সামনেই।
উকিল সাহেবকে সমস্তটা বললাম।যে আমার স্ত্রীকে আমি ডিভোর্স দিতে চাই।সেটার জন্য কাগজপত্র রেডি করতে কতদিন লাগবে?
--আমাকে দশ থেকে পনেরো দিন সময় দিন।এর মধ্যে ডিভোর্স পেপার রেডি করে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিব।
--আচ্ছা ঠিক আছে।
ফোন রেখে দিলাম।ফাহমিদা তো সেই খুশি।ফোনটা লাউডে ছিলো।সবটাই ফাহমিদা শুনেছে।সে খুশিতে আমার গালে একটু চুমু বসিয়ে দিলো।
--স্যার,আমার না নাচতে ইচ্ছে করছে।
--আরেহ,ফাহমিদা কুল।এত এক্সাইটেড হচ্ছো কেনো?
আগে ডিভোর্সটা হয়ে যাক।পরে ইচ্ছে মত নাচানাচি করিও।
--স্যার,তাহলে আর দশ থেকে পনেরো দিন ওয়েট করতে হবে আমাকে?
--হা,
আচ্ছা এবার তুমি যাও।আমি কাজ শেষ করি।
--আচ্ছা...
--ফাহমিদা চলে গেলো।আমি কাজে মন দিলাম।
কিন্তু কাজে মন বসছে না!আমি যা করছি,ঠিক করছি তো?নিজেকেই প্রশ্ন করলাম।তৎক্ষনাৎ সাজিয়ার অপকর্মের কথা মনে হলো।সে যদি অন্য লোক কে বাসায় নিয়ে এসে...
তাহলে আমি কেনো অন্য নারীর হাত ধরতে পারবো না।
নাহ,যা করছি একদম ঠিকই করছি।এতো ভেবে লাভ নাই আর।কাজে মন দিলাম।কাজ শেষ করে রাতের বেলায় বাসায় চলে গেলাম।
সাজিয়া তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে!
--হা বলো?
--দশ থেকে পনেরো দিনের মধ্যে তোমায় ডিভোর্স দিয়ে ফাহমিদাকে বিয়ে করবো আমি।
--আচ্ছা বিয়ে করো সমস্যা নেই।আমিও চাই তুমি ফাহমিদাকে বিয়ে করো।কারন মনের মানুষের সাথেই সংসার করা উচিৎ ।তবে চিন্তা করো না,এ নিয়ে আমি কোনো মন খারাপ করবো না।তোমায় বলেছি না,যে আমি হাসি মুখে বিদায় হয়ে যাবো।টেনশনের কিছুই নেই।তবে তোমাকে আমার একটা কথা রাখতে হবে?
--কি কথা বলো?আমি রাখবো।
--যতদিন ডিভোর্স না হয়,ততদিন তোমাকে আমায় ভালোবাসতে দিতে হবে।তুমি ভালোবেসো না,সমস্যা নেই।তবে আমাকে ভালোবাসার অধিকার টুকু দিতে হবে তোমাকে!
--এটা কেমন কথা সাজিয়া?
ডিভোর্স হয়ে যাবে কয়দিন পর।তাহলে তুমি আমায় এ কয়দিন ভালোবেসে কি করবে?
--ভালোবেসে কি করবো,সেটা আমার উপরে ছেড়ে দাও।ভালোবাসতে দিবা সেটা খালি বলো?
--আচ্ছা যাও ভালোবেসো।তবে কিন্তু আমি ফাহমিদাকেই বিয়ে করবো।আর আমার থেকে কোনো ধরনের ভালোবাসা পাওয়ার আশা করবে না তুমি।
--আচ্ছা...
--সাজিয়া,হাসিমুখে আমার আর ফাহমিদার বিয়ে মেনে নিলো।অবাক লাগলো বিষয় টা আমার কাছে!
ধুর যা হবে হোক।নিজের রুমে এলাম।রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে আছি।ফাহমিদাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।
সকাল বেলা...
ঘুম থেকে উঠে দেখি সাজিয়া টেবিলে নাস্তা সাজাচ্ছে।
আজ আমার পছন্দের নাস্তা বানিয়েছে সাজিয়া।গরুর গোশত,আর পরোটা।দেখেই তো জিভে জ্বল চলে এলো।হাত,মুখ ধুরে খেতে বসলাম।যখনি লোকমা দিব,তখনি সাজিয়া এসে খাবারের প্লেট টা সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে গেলো!
--এই একদম খাবারে হাত দিবা না তুমি।
আমি তোমায় খাইয়ে দিব নিজের হাতে।তাই তোমার পছন্দের খাবার রান্না করেছি।
--অবাক চোখে তাকিয়ে আছি সাজিয়ার দিকে!
সাজিয়া আমায় নিজের হাতে খাইয়ে দিলো।বারন ও করতে পারলাম না তাকে।কারন গতকাল তাকে এ কয়দিন ভালোবাসার অধিকার দিয়েছি।সে আমায় খাইয়ে দিয়ে মুখ মুছে দিলো শাড়ির আঁচল দিয়ে।
আমি খেয়ে দেয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হলাম।ঘর থেকে বের হবো,তখনি পিছন থেকে সাজিয়া ডাক দিলো...
--এই দাঁড়াও,
--সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম।সে আমার কাছে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলো।পরে কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো...
--এবার যাও,রাস্তায় যাওয়ার সময় তোমার উপরে আর কারোর বদ নজর লাগবে না।সবটা আমার উপর দিয়ে যাবে।
--অফিসে চলে এলাম।
এভাবেই দিন ঘন চলতে লাগলো।ডিভোর্সের ডেট প্রায় চলেই এসেছে।ফাহমিদা এর মধ্যে আমার সাথে আরো ক্লোজ হয়ে গেলো।এদিকে সাজিয়া আমার কেয়ার করা আরো বাড়িয়ে দিলো।রোজ বাসায় আমার পছন্দের খাবার রান্না করে।পরে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।মাঝের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বুকের মধ্যে কয়েকটা চুমু খায়।রাতের বেলায় আমি ঘুমানোর আগে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
ডিভোর্সের আর তিনদিন বাকি।সাজিয়া হটাৎ করেই পাল্টে যায়।আমার খাবার ফেভারিট খাবার রান্না করা তো দূরের কথা,নরমাল কোনো কিছুই রান্না করে না।সারা দিন রাত ফোন নিয়ে লেগে থাকে।কার সাথে যেনো হেসে হসে কথা বলে।বিষয়টা নিয়ে কেমন যেনো একটা মনের মধ্যে কৌতুহল সৃষ্টি হয়!কার সাথে কথা বলে সাজিয়া এতো!সাজিয়ার কথা বলার ধরণ দেখে গায়ে কাটা ফুটার মতন জ্বালা করতে লাগলো
হুট করে জিগ্যেস করেই ফেললাম,সাজিয়া এতো কথা কার সাথে বলো তুমি?
--সেটা যেনে তুমি কি করবে?
সামনে তোমার বিয়ে হবে।সেই দিকে ফোকাস করো তুমি।এখন তোমার আসেপাশের এতকিছুতে কান দিলে চলবে না।
--সাজিয়ার কথা শুনে আর কিছু বলার মতন সাহস করতে পারলমা না।আর করবোই বা কি করে,দুইদিন পর ডিভোর্স দিয়ে ফাহমিদাকে বিয়ে করবো।এরপর ওর উপরে তো কোনো অধিকার এই থাকবে না আমার।আর সব চেয়ে বড় কথা আমি যদি অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক করতে পারি,তাহলে সে কেনো অন্যের সাথে কতা বলতে পারবে না।নাহ,ওর বিষয় নিয়ে আর মাথা ঘামাবো না।কিন্তু কেনো জানি ও অন্যের সাথে কথা বলে,সেটা আমার সহ্য হচ্ছে না।তার উপরে তার কেয়ার গুলোকেও মিস করতে লাগলাম।সে আমার কেয়ার করা বাদ দিয়ে সারাদিন ফোনের মধ্যে পড়ে থাকে।তাও কিছু বললাম না।
তিনদিন পর ডিভোর্সের কাগজ এলো।ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে বুকটা ধরফর করছে!হাতটা যেনো কাজ করাই বন্ধ করে দিয়েছে।ডিভোর্স পেপারে সাইন করার মতন শক্তি যেনো যোগাতে পারছিলাম না আমি।কিন্তু ফাহমিদার পিড়াপিড়িতে মনটা শক্ত করে সাইন করে দিলাম।কাগজ উকিল এসে আমার অফিসেই দিয়ে গেছে।আমি সাইন করে বাসায় গিয়ে সাজিয়াকে কাগজটা দিলাম।নাও,এটাতে সাইন করলে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে।সে হেসে হসে উত্তর দিলো...
--ওকেহ সাইন করে তোমার কাছে কাগজ পাঠিয়ে দিব আমি।এখন চললাম।তুমি আসার আগেই সব গুছিয়ে রেখে দিয়েছিলাম আমি।এখন চলি...
--সাজিয়া চলে যাচ্ছে।সাজিয়ার চলে যাওয়া দেখে যেনো আমার ভিতরে সুনামির মতন ঝড় বয়ে যাচ্ছে!
পিছন থেকে ডাক দিলাম সাজিয়াকে..
সাজিয়া কোথায় যাবে তুমি?
--মিস্টার আকাশ,আমার উপরে থেকে আপনার সমস্ত অধিকার শেষ।আর এখন আমি কোথায় যাবো,সেই কৈফিয়ত আমি আপনাকে দিব না।সো ভালো থাকেন আপনি।চললাম...
--সাজিয়া চলে গেলো।কয়েক সেকেন্ড জায়গার মধ্যে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম!সব কিছুই যেনো চটজলদি হয়ে গেলো।তখনি ফাহমিদা ফোন দিলো...
--ম্যাডাম চলে গেছে?
--হ্যা,
--তাহলে আগামীকাল আমরা বিয়ে করছি?
--ফাহমিদার কথার কোনো উত্তর এই দিলাম না আমি।বিরক্ত লাগছে সব কিছু।রঙিন দুনিয়াটা যেনো ধোঁয়াশার মতন হয়ে যাচ্ছে।ফোনটা কেটে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছি।অনুভব করার চেষ্টা করছি কি ঘটেছে আমার সাথে।কোনো কিছুই চোখে ভাসছে না আমার।শুধু বারবার সাজিয়ার কথা মনে পড়ছিলো।
পরেরদিন সকালে..
ফাহমিদা এসে বাসা থেকে আমায় রেডি করিয়ে কাজির কাছে নিয়ে গেলো।আজ আমাদের বিয়ে হবে।কিন্তু মনের মধ্যে কোনো শান্তি নেই।হতাশা কাজ করছে কেমন যেনো এক ধরনের।কাজি বিয়ে পড়াচ্ছে।
আমাকে কবুল বলতে বলতো।আমি কবুল বললেই আমার আর ফাহমিদার বিয়ে হয়ে যাবে।তখনি ফোনের টোনটা বেজে উঠলো।পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখি,একটা মেইল এসেছে।মেইলটা চেক করতেই মাথা ঘুরে গেলো আমার!সাথে সাথেই ধাপাসস করে মাটিতে বসে পড়লাম!